Tuesday, March 1, 2022

লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন বই সম্পর্কে একটি অপূর্ণাঙ্গ পাঠপ্রতিক্রিয়া


 



বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে যে কয়েকজন কবির কবিতা আমার ভালো লাগে, তার মধ্যে মোহাম্মদ জসিমের কবিতা অন্যতম। তার 'কোলাহল চিহ্নিত ' ও ' অসম্পাদিত মানুষের মিথ" বইদুটো পড়ার সুযোগ হয়েছিল এক বছর আগে। 'অশ্বখুর ও অন্যান্য টগবগ' বইটি নেব নেব করে নেয়া হয়নি।যার পাঠাবার কথা ছিল, তিনি পাঠাননি। এই বইমেলায় জসিমের " লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন " প্রকাশিত হয়েছে। গত দু/তিনদিন আগে বইটি পড়ে শেষ করেছি। বই হাতে পাওয়ার আগে থেকেই একটা পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার ইচ্ছে ছিল। যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম সেটা বোধ হয় আর হয়ে উঠবে না। আমার টেবিলে অনেকগুলো বই জমে আছে, এদিকে সময়ও খুব বেশি দেয়া যাচ্ছে না। একটা বই নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছুটা সময় তো দেয়ার দরকার পড়ে। তাড়াহুড়ো করে কিছু বলতে গেলে বইয়ের প্রতি ন্যায়বিচার করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। আমার এই তাড়াহুড়ো করে লেখা প্রতিক্রিয়ায় এই অসুবিধা মেনে নিয়েই দু' চার কথা বলে নেয়ার সাহস করি।
'লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন ' বইটির ইংরেজি নাম নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। নামটি একটি ভিন্ন ব্যঞ্জনা দেয়। নিজেকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে প্রথমেই চিনিয়ে দেয়। জুলিয়েট যে বলেছিল, নামে কি এসে যায়? সেই কথার পিঠে বলতে হয় নামে অনেককিছু এসে যায়। তবে নামই সর্বস্ব নয়। নাম ও প্রচ্ছদ বইকে নান্দনিক করে তোলে। কিন্তু কেবল এই পোশাকি সৌন্দর্যে মোহিত হলে শেষে কবিতাপাঠ বিস্বাদ ঠেকে যদি টেক্সট ভালো নয়। মোহাম্মদ জসিমের টেক্সট ভালো ( মানে আমার ভালো লেগেছে দুটি বইয়ে, ভালো কি মন্দ কি করে বুঝি বলে চ্যালেঞ্জ করলে বলব আমার কাছে তা মাপার জন্য নিজের পাঠ অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নেই।আগেই দায়মুক্তি নিলাম)। পূর্ব পাঠের অভিজ্ঞতায় এই বইয়ের প্রতি একটা প্রত্যাশা থাকাটা বোধ করি দোষের নয়। আল নোমানের করা চমৎকার প্রচ্ছদ অতিক্রম করে আসুন ভেতরে প্রবেশ করা যাক।
" পৃষ্ঠা বিন্যাস" এ একটি প্রবেশ গদ্যের সাক্ষাৎ পাই। হেনরী স্বপনের লেখার শিরোনাম দেখে আর এগোতে ইচ্ছে করে না। টেক্সট পড়ার আগে প্রবেশ গদ্য পড়াটা কবিতার প্রতি আমার নিজস্ব দৃষ্টিকে বিঘ্নিত করবে বলে সেটাকে এই স্থলে বাদ দেয়াই যুক্তিযুক্ত। এই বইয়ে কবিতা আছে ৫২ টি। কিছু কিছু নাম ইংরেজি বাক্য বাংলায় লেখা। আগে কবিতার নাম পড়তে শুরু করি। " লেট মি ডাই অর ফিনিশ মাই ড্রিমস" " ইট ওয়াজ ড্রিজলিং হোল নাইট" " অার্টস ডেথস এ্যান্ড ক্লাউনস" " ইনসাইড দ্য ব্লু বাস্কেট " " রে ভ্যু লি উ শ ন" " সিটি অব লাইস" " এনগেজমেন্ট " " ডেথ এ্যান্ড কিসেস" " ব্রেক আপঃ আ পোস্টমডার্ন সিনেমা" " নট ফর সেল" " ব্ল্যাক এ্যারোঃ টেল অব আ বাস্টার্ড " Feel in the blanks" " ননসেন্স ভার্স" " মাই লোনলি ক্লাউডস" " এ্যানাদার ডার্ক ইলিউশন" লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন " " মাই স্যাকরেড হোর" আমি হাঁপিয়ে উঠি। অনেক সময় একটি অনুভূতিকে একটি ভাষায় যেভাবে প্রকাশ করা যায় অন্য ভাষায় তার অনুবাদে সেটা আসে না জানি, কিন্তু এতগুলো কবিতার পর পর ইংরেজি শিরোনামে বুঝতে পারিনা বাংলায় ঠিক প্রকাশ সম্ভব ছিল কি না! অবশ্য কিছু কিছু কবিতার সাথে শিরোনামগুলো চমৎকার মেলে ( মোহাম্মদ জসিম বলতে পারেন সবই ঠিক আছে, আপনি বোঝেননি- তবে সেটাই সই")। এবার কবিতা পড়তে শুরু করি।
কবিতা কি? এর উত্তর কেউ কেউ দাবি করে। অনেক সময় ঠিক সংগা দিয়ে সেটা বোঝানো যায় না। আবার কোনটা কবিতা, কোনটা কবিতা নয় কিংবা কতটুকু কবিতা বা কবিতা নয় সেটা মাপার কবিতা মিটার যেহেতু আমার কাছে নেই, আমি নিরুপায়। আমার কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমার প্রতিক্রিয়া জানানো, আরো স্পষ্ট করে বললে ভালো লাগা মন্দ লাগা জানানোর পথটাই আমার কাছে সহজ পথ। কঠিনেরে এই স্থলে ভালোবাসিলাম না!
" লেট মি ডাই অর ফিনিশ মাই ড্রিমস" কবিতা দিয়ে শুরু করি। মোহাম্মদ জসিমের কবিতা মূলত নিরীক্ষাধর্মী।তিনি ক্রমাগত কবিতার শরীর বদলাচ্ছেন।নতুনতর বিন্যাসে উপস্থাপন করছেন। শব্দের ব্যবহার থেকে উপমা, উৎপ্রেক্ষায়, ভাব ভঙ্গিমায় কবিতা পাঠের নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার তিনি করতে পারেন তার লেখায়। এই বইটি পড়তে শুরু করলে সেটা বুঝতে পারি। শব্দের যোগ বিয়োগে ভাষা ও ভাবের বহুতর পরিবর্তন ও বহুতর ব্যাঞ্জনার সৃষ্টি হয়। ক্লাসিক কবিরা যে বলে থাকেন" কবিতা হলো শব্দের সাথে শব্দের বিয়ে" সেটাও এই বইয়ে পাই। তবে বিবাহ পরবর্তী মান অভিমান, ঠোকা- ঠুকি, এমনকি বিচ্ছেদের রূপগুলোও এখানে পাই। শব্দের মিলনের অমসৃণতাও তাই প্রকাশিত কোথাও কোথাও। ব্যকরণ ও অধ্যাপকীয় তত্ত্ব চিন্তার মন্দা ভাব ও জ্ঞানের অভাব হেতু কবিতার করণ-কৌশলের দিকে পা বাড়াতে আমি যাইনা। অামার সম্বল কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা ও আমার কান। প্রথম কবিতা পড়তে গিয়েই মাঝে ঢুকে পড়ে অন্ত্যমিলের দ্বিপদীগুলো।যেমনঃ
সেই বাড়িটার সুখরা
ভীষণ রকম মুখরা!
.
সেই বাড়িটার ফুলরা
ঢেউভাঙনের কূলরা!
.
সেই বাড়িটার পাখিরা
ছল মাখানো আঁখিরা!
আমার ঠিক ভালো লাগে না।কবিতা পড়তে পড়তে কম বেশি সকল কবিতায় এমন ব্যাপার দেখি। কখনো মনে হয় রহস্যাবৃত ধাঁধা, কখনো মনে হয় অহেতুক ছড়ার কাটাকুটি, কখনো সত্যি সত্যি তা ভাবের বহুতর পরিবর্তন ঘটায়, চিন্তার ভেতরে ঢুকতে ইশারা করে। আমি তাই ভিন্ন ফন্দি আঁটি। প্রথমবার সব ঠিকঠাক পড়ে যাই। দ্বিতীয়বার কেবল এই অন্ত্যমিলের পদগুলো পড়ি। তৃতীয়বার এগুলো বাদ দিয়েই কবিতা পড়ি। আমার মনে হয় হয় অধিকাংশ কবিতার ক্ষেত্রে এই পদগুলো না থাকলেও চলে। আমি যেভাবে পড়ছি এভাবে পড়াটা ঠিক কি বেঠিক জানিনা। আমার কবিতা পাঠের আনন্দ নষ্ট করেছে এই গুলি।
.
পি কা সো
বেশ্যার কবি, তুমি ঠিক আছো?
.
ভি ঞ্চি
প্রেম বেচে আমি পুরুষাঙ্গ কিনছি!
.
কা হ লো
কামশিল্পে উহঃ হলো, আঃ হলো!
" লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন" বইয়ের কবিতাগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ এখন নেই এটা শুরুতেই বলেছি। জসিমের কবিতা আমাদের ভাবায়৷ আমাদের কখনো বিস্মিত করে। সেটা একটা দুটো লাইন তুলে দিলে ঠিক কতটুকু বোঝা সম্ভব জানিনা। কবিতা নিয়ে অারেক দিন লেখার ইচ্ছে আছে। এই বইয়ে ভালো লাগার মতো অনেক কবিতার লাইন আছে। অনেক পূর্ণাঙ্গ কবিতা আছে। " আর্টস ডেথস এ্যান্ড ক্লাউনস" " ইনসাইড দ্য ব্লু বাস্কেট " " জানকীবাঈ নাচিলো যে রাতে" " সিটি অব লাইস" " কয়েকটি স্লো- মোশনড দৃশ্য " " ডেথ এ্যান্ড কিসেস" " আবহাওয়া সংবাদ আর মেগাসিটি রাত" " পাগলের রাশিফল " " নট ফর সেল" " Feel in the blanks " " শিশুনিকেতন মাধ্যমিক বিদ্যালয়" " জোয়ার ভাটা" " ফুলের কফিন" " আত্ম প্রকৃতিঃ মোহাম্মদ জসিম ও মুনলাইট ফুটনোটস" কবিতাগুলো ভালো লেগেছে। যে কবিতার নাম বলা হয়নি সেগুলোর ভেতরের ছড়িয়ে থাকা কিছু কিছু লাইন ভালো লেগেছে।
বইটি নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া ভালো মন্দ মেশানো। যতটা বলতে চেয়েছি লেখা শেষে মনে হলো সেটা খুব সামান্য বলেছি, অপ্রয়োজনীয় কথা বলেছি বেশি। এবার প্রবেশগদ্যের শিরোনাম নিয়ে কথা বলি।( গদ্যটা এখনো পড়িনি) । উত্তর আধুনিক কবিতার আর্কিটাইপ কেমন হয় সে ব্যাপারে আমি মূর্খ। আমার অত বিদ্যা- শিক্ষা নেই। তবে "কবিতায় উত্তর আধুনিকতা " এর উপাদান হয়ত কিছু কিছু আছে, থাকবে। তবে এগুলোকে প্রথমেই সন্দেহের চোখে দেখার পক্ষে আমি। আর কবিতায় বিমূর্ত রূপ দেয়ার চেষ্টায় কবিতার সৌন্দর্য ( পাঠের আনন্দ) ব্যহত হলে, পাঠকের কাছে তা অপ্রয়োজনীয় শব্দের কচকচানি, কবিতা কম শব্দের ঝনঝনানি সর্বস্ব লেখাজোখা হলে, কবিতার উদ্দেশ্য ব্যহত হয় বোধ হয়।
মোহাম্মদ জসিম এর " লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন " নানা বৈচিত্র্যে, আবার কখনো একঘেয়েমিতে ঠাসা। কবিতা পাঠের আনন্দ পাওয়ার সাথে সাথে কিছু জায়গায় সেটা ব্যাহত হতেও দেখা গেলো। তবে কবিতা গুলো ভাবাবে। চিন্তার খোরাক জোটাবে। সবথেকে বড় কথা হলো আপনাকে কবিতাগুলো সময় নিয়ে পড়তে বাধ্য করবে। কবিতাকে ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলা কবির কবিতা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয়ত প্রশ্ন আসবে " তুমি কোন ভাঙনেরও পথে এলে সুপ্ত রাতে"..... কবিতা পড়ুন। আশা করছি নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
বইঃলাঞ্চ বিফোর ইউটার্ন
লেখকঃমোহাম্মদ জসিম
ধরনঃ বাংলা কবিতা।
প্রচ্ছদ: আল নোমান
প্রকাশ কালঃ অমর একুশে বইমেলা-২০২২
প্রকাশকঃ বাউন্ডুলে।
মূল্যঃ ১৫০ টাকা।

Monday, February 21, 2022

ম্যাক্সিম গোর্কির পৃথিবীর পাঠশালায়



আমার বন্ধু অালেক্সেই মাক্সিমিচ পেশকভের সাথে পরিচয় আমার বিলম্বিত কৈশোরে। তারপর অনেক সময় কেটেছে। ভুলে গিয়েছি মাক্সিমিচের কথা। এমনকি সে বইটারও কথা যার মাধ্যমে তার সাথে পরিচয়।
বইটার শুরুটা এভাবেঃ
" তাহলে আমি কাজান শহরে চলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে- কম কথা নয়!
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চিন্তাটা আমার মাথায় ঢুকিয়েছিল নিকোলাই ইয়েভরেইনভ নামে স্কুলের এক ছাত্র। ইয়েভরেইনভকে দেখলেই ভালো লাগে, সে খুবই প্রিয়দর্শন তরুণ, মেয়েদের মতো কোমল তার চোখ দুটো। আমার সঙ্গে একই বাড়ির চিলেকোঠায় থেকেছে সে। প্রায়ই আমার বগলে এক- আধখানা বই দেখে আমার সম্পর্কে ওর এত আগ্রহ জন্মায় যে আলাপ- পরিচয়ও করে নেয়। তারপর দু-দিন না যেতেই সে আমায় উঠে পড়ে বোঝাতে থাকে আমার নাকি ' অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রকৃতিদত্ত' সম্ভাবনা রয়েছে।
সজোর সুললিত ভঙ্গিতে মাথার লম্বা চুলগুলো ঝাঁকুনি দিয়ে পেছনে সরিয়ে সে বলত, ' জ্ঞান বিজ্ঞানের সেবার জন্যই প্রকৃতি তোমায় সৃষ্টি করেছে।'
খরগোশ হিসেবেও কেউ যে জ্ঞান বিজ্ঞানের সেবা করতে পারে সে- বোধ তখনও আমার জন্মায়নি, এদিকে ইয়েভরেইনভ কিন্তু আমায় জলের মতো সোজা করে বুঝিয়ে দিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি ঠিক আমার মতো ছেলেদেরই অভাব রয়েছে। পন্ডিত মিখাইল লমনোসভের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তটাও সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরল সে। ইয়েভরেইনভ বলল, কাজানে তার সঙ্গে থেকে আমি শরৎ আর শীতের সময়টায় স্কুলের পাঠ একেবারে সড়গড় করে ফেলব, তারপর আমার 'দু- চারটে' পরীক্ষা দিতে হবে - 'দু-চারটে', কথাটা সে ওইভাবেই বলেছিল; বিশ্ববিদ্যালয় আমায় বৃত্তি দেবে; এবং বছর পাঁচেকের মধ্যেই আমি একজন ' বিদ্বান ব্যক্তি ' হয়ে যাব।ব্যস্, জলবৎ তরলং.... "
অতঃপর মাক্সিমিচ দিদিমাকে কাঁদিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলল বিশ্ববিদ্যালয় পড়বে বলে। বিংশ শতাব্দীর জার শাসিত রুশ সাম্রাজ্যে অাশ্রিত থেকে, রুটির দোকানে কারিগরের সাগরেদি করে অনেক বইপত্র পড়তে পারলেও শেষ পর্যন্ত কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছিল কি না জানা যায় না। এই যে আশ্রিত জীবন, কুকুরের মতো জীবন, রুটির দোকানের সাগরেদির জীবন কিংবা গোপন বিপ্লবী সংঘের কার্যক্রম ও পাঠচক্রগুলোকে অ্যালেক্সেই মাক্সিমিচ বলেছেন My Universities. উপন্যাসের ( আমি উপন্যাস বলতে নারাজ অবশ্য) শেষটায় তাকে দেশান্তরি হতে দেখা যায় খালাসিদের সাথে....। বহুদিন কেটে গেছে। আমি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি পড়তে এমন অমিত সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু সেখানে অতিবাহিত ৫ বছরে আমার ঝুলিতে ধুলোকণাও জমেনি। মাক্সিমিচের পাঠশালাগুলো তাকে যেভাবে শিখিয়েছে জীবনের গভীর পাঠ, তার তুলনা নেই।...... বইটি নিয়ে বিস্তর লেখার যোগ্যতা আমার এখনও হয়নি বলে আমার বিশ্বাস।
দীর্ঘ ৬/৭ বছর পর বইটি দেখে মনো হলো কৈশোরের বন্ধুর সাথে পুনর্মিলন হলো। নতুন করে পড়তে শুরু করে দিয়েছিলাম দুদিন আগে।গতকাল ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বৃষ্টি, সারাদিন বিদ্যুৎ নেই, ফোন বন্ধ হয়ে গিয়ে অঢেল সময় হাতে ছিল।বইটি আদ্যোপান্ত পড়া হলো। একশ বিশ পৃষ্ঠার ছোট্ট বইটি পড়তে হাঁপিয়ে উঠেছি- এই হচ্ছে বর্তমান পাঠের অবস্থা!! ম্যাক্সিম গোর্কির এই বইটির ইংরেজিতে নাম My Universities.রুশ ভাষায় কখনো পড়া হবেনা হয়ত।তবে ইংরেজি ভাষায় পড়ার ইচ্ছে আছে। আমার কাছে থাকা বাংলা বইটির নাম " পৃথিবীর পাঠশালায়"। রথীন্দ্র সরকার অনূদিত।
মায়েস্ত্রো ম্যাক্সিম গোর্কির সব লেখা আমার পড়া হয়নি।এখনো সেসবের জন্য উদগ্র কামনা বোধ করি....



Saturday, December 4, 2021

বুক রিভিউ : তারেক মাসুদ : শূন্যের ভেতর এতো ঢেউ


 
 
 
 
 

 
 
বইটির অর্ধেক অংশ পড়েছি গলির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, পদ্মার তীরে বিকেলের রোদ গায়ে মাখতে মাখতে এবং বাকি অংশ রাস্তার পাশে বসে। বইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয়নি, আবার বইটি পড়ে যে সময়ের অপচয় হয়েছে সেটাও নয়। তারেক মাসুদের মা নুরুন্নাহার মাসুদ কথা বলেছেন তার ছেলে তারেক মাসুদকে নিয়ে। তার নিজের কথাও বলেছেন অবশ্য তবে সেগুলোতেও বিভিন্নভাবে ঘুরে ফিরে এসেছে তারেক মাসুদের কথা। নুরুন্নাহার মাসুদের বলবার ধরনটা ভালো লেগেছে। অবশ্য সম্পাদক যদি ঠিক ঠিক তার রেকর্ড থেকে শ্রুতি লিখন করে থাকেন তো। নুরুন্নাহার মাসুদের স্মৃতিচারণের ভেতর উঠে এসেছে তারেক মাসুদের বাবার কথা। মাটির ময়না চলচিত্রের আনুর বাবার কথা। তারেক মাসুদের মা স্পষ্ট করেই বলেন মাটির ময়না তারেক মাসুদের নিজের জীবনের কথা। কাগজের ফুল - হওয়ার কথা ছিল তার বাবার জীবন নিয়ে। তারেক মাসুদের মা বলতে চান, রানওয়ে সিনেমার জন্য তারেক মাসুদকে হত্যা করে হয়েছে। এই এক্সিডেন্ট সাধারণ নয়, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে থাকলে সেটা তারেকের মায়ের জবানিতে তার ছেলের শৈশব, বেড়ে ওঠা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কিছু কথাবার্তা। আলম খোরশেদ যা বলেছেন বলতে চেয়েছেন সেটা কমবেশি সবাই জানে৷ তার তথ্যে কিছু অসংগতিও আছে।তিনি ক্যাথরিন সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন তা তারেক মাসুদের মায়ের দেয়া তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারেক মাসুদের সাথে সলিমুল্লাহ খানের দূরত্বের কারণটা আসল ঘটনা না জেনেও সম্ভবত আন্দাজ করে নেয়া যায়। সলিমুল্লাহ খান পন্ডিত মানুষ, তত্ত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ।তত্ত্বের চোখ দিয়ে তিনি দেখতে চাইবেন এটা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পী, লেখক বা নির্মাতার চোখ তো সেভাবে দেখতে চাইবে না। এখানেই সৃষ্টিশীল নির্মাতা / শিল্পীর সাথে তত্ত্ব কপচানো ভদ্রলোকদের আজীবনের মতানৈক্য। অবশ্য সলিমুল্লাহ খান তারেক মাসুদের সিনেমা কিভাবে বিশ্লেষণ করেন সেটা জানতে পারলে মন্দ হত না৷
এই বই না পড়লেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ এতে এমন কিছু নেই যেটা না হলে তারেক মাসুদকে বোঝা যাবেনা। আমি গরীব পাঠক। সস্তায় পেয়েছি তাই কিনেছি।( মাঝে মাঝে বই না কিনলে ভালো লাগেনা)। এর থেকে কথা প্রকাশ থেকে বের হওয়া " চলচ্চিত্র যাত্রা" বইটি নিতে পারলে ভালো হত।
বইয়ের নামঃ তারেক মাসুদ : শূন্যের ভেতর এতো ঢেউ
প্রকাশকঃ ম্যাজিক লন্ঠন প্রকাশন
মূল্যঃ ৬০ টাকা

 

অনর্থক কথাবার্তা, বই ও হাবিজাবি


 


 

আমি ফটোকপি বই পড়ি।মানুষের ফেলে দেওয়া বই, কাগজ কুড়িয়ে পড়ি। কেজি দরে বই কিনে ঘর নোংরা করি। মাঝে মাঝে পয়সা নষ্ট করে বই কিনেও পড়িনা। কিছু বই কেনার সাথে সাথে পড়ে ফেলি।কখনো বিলাস করে চকচকে বই আনি। দামি বই। হাত বুলাতে ভালো লাগে, গন্ধ নিতে ভালো লাগে। গন্ধটা কিসের? ঝকঝকে চকচকে পৃথিবী কি অন্বিষ্ট? বই কিনি।বই জমিয়ে রাখি।ধূলো পড়ে, ইঁদুরে এসে নষ্ট করে যায়। উইপোকা অর্ধেক খেয়ে ফেলে যায়। ইঁদুরের পিন্ডি চটকাই। উই পোকার অনাগত আঠারো প্রজন্মের জন্য শাপ- শাপান্ত করি। জল, শৈত্য, আর্দ্রতা, অধিক তাপ, ইঁদুর, উইপোকা বইয়ের শত্রু। সবথেকে বড় শত্রু আমি নিজে। বই বহন করতে করতে বই মলিন হয়, আমি আরও বেশি মলিন হই। বহন করি, বাহন তো করিনা। গলাধঃকরণ করি, হজম তো করিনা। শরীর উজ্জ্বল হয়না, স্মৃতি শানিত হয়না, চোখ অভ্রভেদী হয়না। আমি বইয়ের সাথে ভ্রমণে যাই। অনেক দূরে যাই।আমার বয়স বাড়ে। আমার চোখের বয়স বাড়ে। মাঝে মাঝে আলো দেখা যায়। আমি এক তাল কাদামাটি। কখনো এই আকার, সেই আকৃতিতে রূপান্তরিত হই। রোদে শুকায় না, জলে ভিজে নরম হই। আমার আর কোনো আকৃতি হওয়া হয় না। আমার নবজন্ম হয়।আমি আবার মরে যাই।বইয়ের সাথে আমার অনেক গল্প আছে, একান্ত নিজস্ব গল্প। মানুষের সাথে আমার তেমন গল্প নেই। বই কেন পড়ি? কিছু কিছু বই পড়লে নবজন্ম হয়। আমি বইয়ের কাছে অনেক ঋণী। আমার প্রথম জন্মকে অস্বীকার করেছি। বইয়ের জন্য সেটা পেরেছি।বই না পেলে আমি অসমর্থ হয়ে যেতাম।বই আমার নতুন জন্ম দিয়েছে। নতুন করে জন্মাবার , বেড়ে উঠবার একটা আনন্দ আছে।সব নিরানন্দ ছাপিয়ে এই আনন্দ আমাকে ঘিরে থাকে। বইয়ের সাথে ভ্রমণের আনন্দ আছে।কবিতা পড়লে মনে হয় শরীর হালকা হয়ে হাওয়ায় ভাসছে। পৃথিবীর সমস্ত জীবন ও আপাত অজীব সত্তার সাথে কথপোকথন চলছে ।একটা ঘোরলাগা সংগীতের মূর্ছনায় চারপাশে ভরে যায়।নিজের কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠি। একদা ঈশ্বরের সাধ হয়েছিল মানুষকে কবিতা শোনানোর। সেকথা যাক। আরও যেন কিসব কথা মাঝে মাঝে মনে হয়। এখন সেসব মনে করতে পারছি না। অনেক বছর পর পুরনো কোনো বই ধূলোময়লা ঝেড়ে পড়ার সুযোগটুকু আমি চাই। আমার কোনো অতীত নেই, আর কোনো স্মৃতিও নেই। কিছু বই স্মৃতি চাই। বই ছাড়া আমার আর কিছু সম্পর্কে ধারণা নেই, আবার বই সম্পর্কে খুব ভালো ধারণাও নেই। কোনো কিছু না পারার মতো, কোনোকিছু না হতে পারার মতো ব্যর্থতা আর হয় না। আমি কি হতে চেয়েছি কাউকে বলিনি।বলবও না। সবকিছু জানা হয়ে গেলে মানুষ কি বেঁচে থাকতে চাইবে? বই না পড়েও বেঁচে থাকা যায়। কবিতা না লিখে, গান না গেয়েও বেঁচে থাকা যায়।কিন্তু গান না শুনে কেউ বেঁচে থাকতে পারে? শব্দ নাকি ব্রহ্ম। এই প্রকৃতি গানের পশরা সাজিয়ে রেখেছে। কেউ কেউ মরে যেতে চায়। কেউ আবার ভরা পূর্ণিমায় খুন হতে চায়। দুটো এক নয়। কেউ সন্তানের আগে মৃত হতে চায়( অনুপ দা লিখেছেন এমন কথা) এ মৃত্যু কামনা অন্যরকম। কেউ কেউ কিছু না করেই বেঁচে থাকতে চায় । বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা। আমি অনর্থক বেঁচে থাকতে চাই। বেঁচে থাকার লোভে বেঁচে থাকার মতো নয়।কাশবন, ধানক্ষেত, শিশির ভোর, ভরা চাঁদ না দেখেও আমি বেঁচে থাকতে পারব।পাখির গান ছাড়াও আমি বেঁচে থাকতে পারব।কিন্তু নদী ছাড়া কি বেঁচে থাকতে পারব? নদীর সাথে আমার কিসের যেন বন্ধন আছে।এভাবে কথায় কথায় কোথায় চলে যাই ঠিক থাকেনা। রাত পেরিয়ে সকাল হবে, ক্লান্ত লাগবে, ঘুমাতে ইচ্ছা করবে না, তখনও কেবল কথার জন্যই আকুতি। এই নিজের সাথে কথা বলতে বলতে দিনের পর দিন চলে যাবে, রাতের পর রাত চলে যাবে।এই রাতের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেলো আরব্য রজনীর কথা- এক সহস্র এক রাত্রির গল্প। আলিফ লায়লা ও লায়লা।এক মুফতি সাহেব একদিন শুধরে দিলেন আলিফ লায়লা ওয়া লায়ল। বইটি আদিরসাত্মক গল্পে ভরা। দৈত্য দানবের গল্পের সাথে পাল্লা দিয়ে সংগমের গল্প। ছোট বেলায় ভাবতাম রূপকথা। আরব্য রজনীর গল্পের দুই ভাই, দুই বাদশার নামটাও মনে পড়ছে না। এক ভাইয়ের নাম শারিয়ার, আরেক ভাইয়ের নাম শাহ জামান। বইটা কিনব। কলকাতা থেকে যেটা ছবিসহ ছাপানো৷ এসব অনর্থক কথার কোনো মানে নেই। এখন এসব থাক।রাত শেষ হয়ে আসছে।আরও কিছু কবিতা পড়া বাকি। আজ পড়তে ভালো লাগছে।
 
ইয়াসির আরাফাত
রাজশাহী
Powered by Blogger.

Formulir Kontak

Name

Email *

Message *

Search This Blog

Subscribe Here

Recent

Flickr