লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন বই সম্পর্কে একটি অপূর্ণাঙ্গ পাঠপ্রতিক্রিয়া
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে যে কয়েকজন কবির কবিতা আমার ভালো লাগে, তার মধ্যে মোহাম্মদ জসিমের কবিতা অন্যতম। তার 'কোলাহল চিহ্নিত ' ও ' অসম্পাদিত মানুষের মিথ" বইদুটো পড়ার সুযোগ হয়েছিল এক বছর আগে। 'অশ্বখুর ও অন্যান্য টগবগ' বইটি নেব নেব করে নেয়া হয়নি।যার পাঠাবার কথা ছিল, তিনি পাঠাননি। এই বইমেলায় জসিমের " লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন " প্রকাশিত হয়েছে। গত দু/তিনদিন আগে বইটি পড়ে শেষ করেছি। বই হাতে পাওয়ার আগে থেকেই একটা পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার ইচ্ছে ছিল। যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম সেটা বোধ হয় আর হয়ে উঠবে না। আমার টেবিলে অনেকগুলো বই জমে আছে, এদিকে সময়ও খুব বেশি দেয়া যাচ্ছে না। একটা বই নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছুটা সময় তো দেয়ার দরকার পড়ে। তাড়াহুড়ো করে কিছু বলতে গেলে বইয়ের প্রতি ন্যায়বিচার করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। আমার এই তাড়াহুড়ো করে লেখা প্রতিক্রিয়ায় এই অসুবিধা মেনে নিয়েই দু' চার কথা বলে নেয়ার সাহস করি।
'লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন ' বইটির ইংরেজি নাম নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। নামটি একটি ভিন্ন ব্যঞ্জনা দেয়। নিজেকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে প্রথমেই চিনিয়ে দেয়। জুলিয়েট যে বলেছিল, নামে কি এসে যায়? সেই কথার পিঠে বলতে হয় নামে অনেককিছু এসে যায়। তবে নামই সর্বস্ব নয়। নাম ও প্রচ্ছদ বইকে নান্দনিক করে তোলে। কিন্তু কেবল এই পোশাকি সৌন্দর্যে মোহিত হলে শেষে কবিতাপাঠ বিস্বাদ ঠেকে যদি টেক্সট ভালো নয়। মোহাম্মদ জসিমের টেক্সট ভালো ( মানে আমার ভালো লেগেছে দুটি বইয়ে, ভালো কি মন্দ কি করে বুঝি বলে চ্যালেঞ্জ করলে বলব আমার কাছে তা মাপার জন্য নিজের পাঠ অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নেই।আগেই দায়মুক্তি নিলাম)। পূর্ব পাঠের অভিজ্ঞতায় এই বইয়ের প্রতি একটা প্রত্যাশা থাকাটা বোধ করি দোষের নয়। আল নোমানের করা চমৎকার প্রচ্ছদ অতিক্রম করে আসুন ভেতরে প্রবেশ করা যাক।
" পৃষ্ঠা বিন্যাস" এ একটি প্রবেশ গদ্যের সাক্ষাৎ পাই। হেনরী স্বপনের লেখার শিরোনাম দেখে আর এগোতে ইচ্ছে করে না। টেক্সট পড়ার আগে প্রবেশ গদ্য পড়াটা কবিতার প্রতি আমার নিজস্ব দৃষ্টিকে বিঘ্নিত করবে বলে সেটাকে এই স্থলে বাদ দেয়াই যুক্তিযুক্ত। এই বইয়ে কবিতা আছে ৫২ টি। কিছু কিছু নাম ইংরেজি বাক্য বাংলায় লেখা। আগে কবিতার নাম পড়তে শুরু করি। " লেট মি ডাই অর ফিনিশ মাই ড্রিমস" " ইট ওয়াজ ড্রিজলিং হোল নাইট" " অার্টস ডেথস এ্যান্ড ক্লাউনস" " ইনসাইড দ্য ব্লু বাস্কেট " " রে ভ্যু লি উ শ ন" " সিটি অব লাইস" " এনগেজমেন্ট " " ডেথ এ্যান্ড কিসেস" " ব্রেক আপঃ আ পোস্টমডার্ন সিনেমা" " নট ফর সেল" " ব্ল্যাক এ্যারোঃ টেল অব আ বাস্টার্ড " Feel in the blanks" " ননসেন্স ভার্স" " মাই লোনলি ক্লাউডস" " এ্যানাদার ডার্ক ইলিউশন" লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন " " মাই স্যাকরেড হোর" আমি হাঁপিয়ে উঠি। অনেক সময় একটি অনুভূতিকে একটি ভাষায় যেভাবে প্রকাশ করা যায় অন্য ভাষায় তার অনুবাদে সেটা আসে না জানি, কিন্তু এতগুলো কবিতার পর পর ইংরেজি শিরোনামে বুঝতে পারিনা বাংলায় ঠিক প্রকাশ সম্ভব ছিল কি না! অবশ্য কিছু কিছু কবিতার সাথে শিরোনামগুলো চমৎকার মেলে ( মোহাম্মদ জসিম বলতে পারেন সবই ঠিক আছে, আপনি বোঝেননি- তবে সেটাই সই")। এবার কবিতা পড়তে শুরু করি।
কবিতা কি? এর উত্তর কেউ কেউ দাবি করে। অনেক সময় ঠিক সংগা দিয়ে সেটা বোঝানো যায় না। আবার কোনটা কবিতা, কোনটা কবিতা নয় কিংবা কতটুকু কবিতা বা কবিতা নয় সেটা মাপার কবিতা মিটার যেহেতু আমার কাছে নেই, আমি নিরুপায়। আমার কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমার প্রতিক্রিয়া জানানো, আরো স্পষ্ট করে বললে ভালো লাগা মন্দ লাগা জানানোর পথটাই আমার কাছে সহজ পথ। কঠিনেরে এই স্থলে ভালোবাসিলাম না!
" লেট মি ডাই অর ফিনিশ মাই ড্রিমস" কবিতা দিয়ে শুরু করি। মোহাম্মদ জসিমের কবিতা মূলত নিরীক্ষাধর্মী।তিনি ক্রমাগত কবিতার শরীর বদলাচ্ছেন।নতুনতর বিন্যাসে উপস্থাপন করছেন। শব্দের ব্যবহার থেকে উপমা, উৎপ্রেক্ষায়, ভাব ভঙ্গিমায় কবিতা পাঠের নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার তিনি করতে পারেন তার লেখায়। এই বইটি পড়তে শুরু করলে সেটা বুঝতে পারি। শব্দের যোগ বিয়োগে ভাষা ও ভাবের বহুতর পরিবর্তন ও বহুতর ব্যাঞ্জনার সৃষ্টি হয়। ক্লাসিক কবিরা যে বলে থাকেন" কবিতা হলো শব্দের সাথে শব্দের বিয়ে" সেটাও এই বইয়ে পাই। তবে বিবাহ পরবর্তী মান অভিমান, ঠোকা- ঠুকি, এমনকি বিচ্ছেদের রূপগুলোও এখানে পাই। শব্দের মিলনের অমসৃণতাও তাই প্রকাশিত কোথাও কোথাও। ব্যকরণ ও অধ্যাপকীয় তত্ত্ব চিন্তার মন্দা ভাব ও জ্ঞানের অভাব হেতু কবিতার করণ-কৌশলের দিকে পা বাড়াতে আমি যাইনা। অামার সম্বল কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা ও আমার কান। প্রথম কবিতা পড়তে গিয়েই মাঝে ঢুকে পড়ে অন্ত্যমিলের দ্বিপদীগুলো।যেমনঃ
সেই বাড়িটার সুখরা
ভীষণ রকম মুখরা!
.
সেই বাড়িটার ফুলরা
ঢেউভাঙনের কূলরা!
.
সেই বাড়িটার পাখিরা
ছল মাখানো আঁখিরা!
আমার ঠিক ভালো লাগে না।কবিতা পড়তে পড়তে কম বেশি সকল কবিতায় এমন ব্যাপার দেখি। কখনো মনে হয় রহস্যাবৃত ধাঁধা, কখনো মনে হয় অহেতুক ছড়ার কাটাকুটি, কখনো সত্যি সত্যি তা ভাবের বহুতর পরিবর্তন ঘটায়, চিন্তার ভেতরে ঢুকতে ইশারা করে। আমি তাই ভিন্ন ফন্দি আঁটি। প্রথমবার সব ঠিকঠাক পড়ে যাই। দ্বিতীয়বার কেবল এই অন্ত্যমিলের পদগুলো পড়ি। তৃতীয়বার এগুলো বাদ দিয়েই কবিতা পড়ি। আমার মনে হয় হয় অধিকাংশ কবিতার ক্ষেত্রে এই পদগুলো না থাকলেও চলে। আমি যেভাবে পড়ছি এভাবে পড়াটা ঠিক কি বেঠিক জানিনা। আমার কবিতা পাঠের আনন্দ নষ্ট করেছে এই গুলি।
.
পি কা সো
বেশ্যার কবি, তুমি ঠিক আছো?
.
ভি ঞ্চি
প্রেম বেচে আমি পুরুষাঙ্গ কিনছি!
.
কা হ লো
কামশিল্পে উহঃ হলো, আঃ হলো!
" লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন" বইয়ের কবিতাগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ এখন নেই এটা শুরুতেই বলেছি। জসিমের কবিতা আমাদের ভাবায়৷ আমাদের কখনো বিস্মিত করে। সেটা একটা দুটো লাইন তুলে দিলে ঠিক কতটুকু বোঝা সম্ভব জানিনা। কবিতা নিয়ে অারেক দিন লেখার ইচ্ছে আছে। এই বইয়ে ভালো লাগার মতো অনেক কবিতার লাইন আছে। অনেক পূর্ণাঙ্গ কবিতা আছে। " আর্টস ডেথস এ্যান্ড ক্লাউনস" " ইনসাইড দ্য ব্লু বাস্কেট " " জানকীবাঈ নাচিলো যে রাতে" " সিটি অব লাইস" " কয়েকটি স্লো- মোশনড দৃশ্য " " ডেথ এ্যান্ড কিসেস" " আবহাওয়া সংবাদ আর মেগাসিটি রাত" " পাগলের রাশিফল " " নট ফর সেল" " Feel in the blanks " " শিশুনিকেতন মাধ্যমিক বিদ্যালয়" " জোয়ার ভাটা" " ফুলের কফিন" " আত্ম প্রকৃতিঃ মোহাম্মদ জসিম ও মুনলাইট ফুটনোটস" কবিতাগুলো ভালো লেগেছে। যে কবিতার নাম বলা হয়নি সেগুলোর ভেতরের ছড়িয়ে থাকা কিছু কিছু লাইন ভালো লেগেছে।
বইটি নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া ভালো মন্দ মেশানো। যতটা বলতে চেয়েছি লেখা শেষে মনে হলো সেটা খুব সামান্য বলেছি, অপ্রয়োজনীয় কথা বলেছি বেশি। এবার প্রবেশগদ্যের শিরোনাম নিয়ে কথা বলি।( গদ্যটা এখনো পড়িনি) । উত্তর আধুনিক কবিতার আর্কিটাইপ কেমন হয় সে ব্যাপারে আমি মূর্খ। আমার অত বিদ্যা- শিক্ষা নেই। তবে "কবিতায় উত্তর আধুনিকতা " এর উপাদান হয়ত কিছু কিছু আছে, থাকবে। তবে এগুলোকে প্রথমেই সন্দেহের চোখে দেখার পক্ষে আমি। আর কবিতায় বিমূর্ত রূপ দেয়ার চেষ্টায় কবিতার সৌন্দর্য ( পাঠের আনন্দ) ব্যহত হলে, পাঠকের কাছে তা অপ্রয়োজনীয় শব্দের কচকচানি, কবিতা কম শব্দের ঝনঝনানি সর্বস্ব লেখাজোখা হলে, কবিতার উদ্দেশ্য ব্যহত হয় বোধ হয়।
মোহাম্মদ জসিম এর " লাঞ্চ বিফোর দ্য ইউটার্ন " নানা বৈচিত্র্যে, আবার কখনো একঘেয়েমিতে ঠাসা। কবিতা পাঠের আনন্দ পাওয়ার সাথে সাথে কিছু জায়গায় সেটা ব্যাহত হতেও দেখা গেলো। তবে কবিতা গুলো ভাবাবে। চিন্তার খোরাক জোটাবে। সবথেকে বড় কথা হলো আপনাকে কবিতাগুলো সময় নিয়ে পড়তে বাধ্য করবে। কবিতাকে ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলা কবির কবিতা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয়ত প্রশ্ন আসবে " তুমি কোন ভাঙনেরও পথে এলে সুপ্ত রাতে"..... কবিতা পড়ুন। আশা করছি নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
বইঃলাঞ্চ বিফোর ইউটার্ন
লেখকঃমোহাম্মদ জসিম
ধরনঃ বাংলা কবিতা।
প্রচ্ছদ: আল নোমান
প্রকাশ কালঃ অমর একুশে বইমেলা-২০২২
প্রকাশকঃ বাউন্ডুলে।
মূল্যঃ ১৫০ টাকা।
