অনর্থক কথাবার্তা, বই ও হাবিজাবি
আমি
ফটোকপি বই পড়ি।মানুষের ফেলে দেওয়া বই, কাগজ কুড়িয়ে পড়ি। কেজি দরে বই কিনে
ঘর নোংরা করি। মাঝে মাঝে পয়সা নষ্ট করে বই কিনেও পড়িনা। কিছু বই কেনার সাথে
সাথে পড়ে ফেলি।কখনো বিলাস করে চকচকে বই আনি। দামি বই। হাত বুলাতে ভালো
লাগে, গন্ধ নিতে ভালো লাগে। গন্ধটা কিসের? ঝকঝকে চকচকে পৃথিবী কি অন্বিষ্ট?
বই কিনি।বই জমিয়ে রাখি।ধূলো পড়ে, ইঁদুরে এসে নষ্ট করে যায়। উইপোকা
অর্ধেক খেয়ে ফেলে যায়। ইঁদুরের পিন্ডি চটকাই। উই পোকার অনাগত আঠারো
প্রজন্মের জন্য শাপ- শাপান্ত করি। জল, শৈত্য, আর্দ্রতা, অধিক তাপ, ইঁদুর,
উইপোকা বইয়ের শত্রু। সবথেকে বড় শত্রু আমি নিজে। বই বহন করতে করতে বই মলিন
হয়, আমি আরও বেশি মলিন হই। বহন করি, বাহন তো করিনা। গলাধঃকরণ করি, হজম
তো করিনা। শরীর উজ্জ্বল হয়না, স্মৃতি শানিত হয়না, চোখ অভ্রভেদী হয়না। আমি
বইয়ের সাথে ভ্রমণে যাই। অনেক দূরে যাই।আমার বয়স বাড়ে। আমার চোখের বয়স বাড়ে।
মাঝে মাঝে আলো দেখা যায়। আমি এক তাল কাদামাটি। কখনো এই আকার, সেই আকৃতিতে
রূপান্তরিত হই। রোদে শুকায় না, জলে ভিজে নরম হই। আমার আর কোনো আকৃতি হওয়া
হয় না। আমার নবজন্ম হয়।আমি আবার মরে যাই।বইয়ের সাথে আমার অনেক গল্প আছে,
একান্ত নিজস্ব গল্প। মানুষের সাথে আমার তেমন গল্প নেই। বই কেন পড়ি? কিছু
কিছু বই পড়লে নবজন্ম হয়। আমি বইয়ের কাছে অনেক ঋণী। আমার প্রথম জন্মকে
অস্বীকার করেছি। বইয়ের জন্য সেটা পেরেছি।বই না পেলে আমি অসমর্থ হয়ে
যেতাম।বই আমার নতুন জন্ম দিয়েছে। নতুন করে জন্মাবার , বেড়ে উঠবার একটা
আনন্দ আছে।সব নিরানন্দ ছাপিয়ে এই আনন্দ আমাকে ঘিরে থাকে। বইয়ের সাথে
ভ্রমণের আনন্দ আছে।কবিতা পড়লে মনে হয় শরীর হালকা হয়ে হাওয়ায় ভাসছে। পৃথিবীর
সমস্ত জীবন ও আপাত অজীব সত্তার সাথে কথপোকথন চলছে ।একটা ঘোরলাগা সংগীতের
মূর্ছনায় চারপাশে ভরে যায়।নিজের কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠি। একদা ঈশ্বরের সাধ
হয়েছিল মানুষকে কবিতা শোনানোর। সেকথা যাক। আরও যেন কিসব কথা মাঝে মাঝে মনে
হয়। এখন সেসব মনে করতে পারছি না। অনেক বছর পর পুরনো কোনো বই ধূলোময়লা ঝেড়ে
পড়ার সুযোগটুকু আমি চাই। আমার কোনো অতীত নেই, আর কোনো স্মৃতিও নেই। কিছু
বই স্মৃতি চাই। বই ছাড়া আমার আর কিছু সম্পর্কে ধারণা নেই, আবার বই
সম্পর্কে খুব ভালো ধারণাও নেই। কোনো কিছু না পারার মতো, কোনোকিছু না হতে
পারার মতো ব্যর্থতা আর হয় না। আমি কি হতে চেয়েছি কাউকে বলিনি।বলবও না।
সবকিছু জানা হয়ে গেলে মানুষ কি বেঁচে থাকতে চাইবে? বই না পড়েও বেঁচে থাকা
যায়। কবিতা না লিখে, গান না গেয়েও বেঁচে থাকা যায়।কিন্তু গান না শুনে কেউ
বেঁচে থাকতে পারে? শব্দ নাকি ব্রহ্ম। এই প্রকৃতি গানের পশরা সাজিয়ে রেখেছে।
কেউ কেউ মরে যেতে চায়। কেউ আবার ভরা পূর্ণিমায় খুন হতে চায়। দুটো এক নয়।
কেউ সন্তানের আগে মৃত হতে চায়( অনুপ দা লিখেছেন এমন কথা) এ মৃত্যু কামনা
অন্যরকম। কেউ কেউ কিছু না করেই বেঁচে থাকতে চায় । বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে
থাকা। আমি অনর্থক বেঁচে থাকতে চাই। বেঁচে থাকার লোভে বেঁচে থাকার মতো
নয়।কাশবন, ধানক্ষেত, শিশির ভোর, ভরা চাঁদ না দেখেও আমি বেঁচে থাকতে
পারব।পাখির গান ছাড়াও আমি বেঁচে থাকতে পারব।কিন্তু নদী ছাড়া কি বেঁচে থাকতে
পারব? নদীর সাথে আমার কিসের যেন বন্ধন আছে।এভাবে কথায় কথায় কোথায় চলে যাই
ঠিক থাকেনা। রাত পেরিয়ে সকাল হবে, ক্লান্ত লাগবে, ঘুমাতে ইচ্ছা করবে না,
তখনও কেবল কথার জন্যই আকুতি। এই নিজের সাথে কথা বলতে বলতে দিনের পর দিন চলে
যাবে, রাতের পর রাত চলে যাবে।এই রাতের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেলো আরব্য
রজনীর কথা- এক সহস্র এক রাত্রির গল্প। আলিফ লায়লা ও লায়লা।এক মুফতি সাহেব
একদিন শুধরে দিলেন আলিফ লায়লা ওয়া লায়ল। বইটি আদিরসাত্মক গল্পে ভরা। দৈত্য
দানবের গল্পের সাথে পাল্লা দিয়ে সংগমের গল্প। ছোট বেলায় ভাবতাম রূপকথা।
আরব্য রজনীর গল্পের দুই ভাই, দুই বাদশার নামটাও মনে পড়ছে না। এক ভাইয়ের
নাম শারিয়ার, আরেক ভাইয়ের নাম শাহ জামান। বইটা কিনব। কলকাতা থেকে যেটা
ছবিসহ ছাপানো৷ এসব অনর্থক কথার কোনো মানে নেই। এখন এসব থাক।রাত শেষ হয়ে
আসছে।আরও কিছু কবিতা পড়া বাকি। আজ পড়তে ভালো লাগছে।
ইয়াসির আরাফাত
রাজশাহী
রাজশাহী

0 comments:
Post a Comment